Designed by AfterTech (elements sourced from the internet)
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় শর্ট-ভিডিও প্ল্যাটফর্ম টিকটকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা যেন কাটছেই না। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থাকাকালীন টিকটকের চীনা মূল সংস্থা বাইটডান্সকে (ByteDance) তাদের মার্কিন কার্যক্রম বিক্রি করার বা নিষিদ্ধ হওয়ার সময়সীমা বারবার বাড়ানো হয়েছিল, যা নতুন করে বিতর্ক ও আইনি জটিলতা সৃষ্টি করেছে। এই বর্ধিতকরণের পেছনের কারণ কী এবং এর আইনগত ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খোদ মার্কিন আইন প্রণেতাদের মধ্যেই।
এই প্রতিবেদনের মূল বিষয়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
- ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন টিকটককে বাইটডান্স থেকে আলাদা করার জন্য তিনবার সময়সীমা বাড়িয়েছিল।
- জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ এবং মার্কিন ব্যবহারকারীদের ডেটা সুরক্ষাই ছিল এই পদক্ষেপের মূল কারণ।
- ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশগুলো আইন দ্বারা সমর্থিত ছিল না, যা আইনি জটিলতা তৈরি করেছিল।
- বাইটডান্স এবং ওরাকলের মধ্যে একটি সম্ভাব্য চুক্তি হলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
- মার্কিন আইন প্রণেতারা, বিশেষ করে সেনেটের সদস্যরা, বারবার সময়সীমা বাড়ানোকে অবৈধ এবং অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন।
- টিকটকের অ্যালগরিদম বেইজিংয়ের হাতে থাকা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
ট্রাম্পের বারবার সময়সীমা বাড়ানোর নেপথ্যে
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন টিকটকের ওপর চাপ বাড়িয়েছিলেন, যাতে বাইটডান্স তাদের মার্কিন কার্যক্রম একটি আমেরিকান কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয় অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ হয়। হোয়াইট হাউসের তৎকালীন প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট নিশ্চিত করেছিলেন যে ট্রাম্প টিকটককে বাইটডান্স থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য সময়সীমা আরও ৯০ দিন বাড়িয়ে একটি নির্বাহী আদেশ স্বাক্ষর করবেন। এই বর্ধিতকরণের উদ্দেশ্য ছিল, “এই চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে তা নিশ্চিত করা যাতে আমেরিকান জনগণ তাদের ডেটা নিরাপদ ও সুরক্ষিত আছে এমন নিশ্চয়তা সহ টিকটক ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারে,” লিভিট জানান।
এই বর্ধিতকরণ ছিল তৃতীয়বারের মতো। প্রথমবার এটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২০শে জানুয়ারি। এর উদ্দেশ্য ছিল টিকটকের মার্কিন পরিষেবা প্রদানকারীদের, যারা ‘প্রোটেকটিং আমেরিকানস ফ্রম ফরেন অ্যাডভার্সারি কন্ট্রোল্ড অ্যাপ্লিকেশনস অ্যাক্ট’-এর অধীনে শত শত বিলিয়ন ডলারের জরিমানার সম্মুখীন হতে পারতো, তাদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া। তবে, এই আইনি সুরক্ষা অনেকটাই নড়বড়ে ছিল, কারণ ট্রাম্পের এই বর্ধিতকরণগুলো কংগ্রেসে বাইপার্টিজান ভোটে পাস হওয়া এবং সুপ্রিম কোর্ট দ্বারা সাংবিধানিক বলে বিবেচিত আইনে সংযোজিত হয়নি। অর্থাৎ, এটি ট্রাম্পের নিজস্ব নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত ছিল, যা আইনের সরাসরি অংশ ছিল না।
বাইটডান্স-ওরাকল চুক্তির ব্যর্থতা এবং অ্যালগরিদম বিতর্ক
দ্য ভার্জ পূর্বে যেমনটি রিপোর্ট করেছিল, বাইটডান্স এবং ওরাকলের নেতৃত্বে একটি জোট এপ্রিল মাসে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছিল। কিন্তু ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক হঠাৎ করেই সেই চুক্তি ভেস্তে দেয়। যদিও পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা কিছুটা কমে এসেছিল, কিন্তু সেই চুক্তি বা অন্য কোনো চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে সম্প্রতি কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এমনকি যখন বিক্রির সম্ভাবনা উজ্জ্বল ছিল, তখনও এটি পরিষ্কার ছিল না যে চীন টিকটকের ভিডিও সুপারিশের চালিকা শক্তি, অর্থাৎ এর মূল্যবান অ্যালগরিদম বিক্রি করার অনুমতি দেবে কিনা।
এই অ্যালগরিদম স্থানান্তরের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বেশ কয়েকজন মার্কিন আইন প্রণেতা মনে করেন যে যদি অ্যালগরিদম বেইজিংয়ের হাতেই থেকে যায়, তবে পুরো চুক্তিটিই অর্থহীন। সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস চেয়ার মার্ক ওয়ার্নার (ডি-ভিএ) দ্য ভার্জকে বলেছিলেন যে এই পদক্ষেপটি “আইনের বিরুদ্ধে” এবং “যদি অ্যালগরিদম বেইজিংয়ের হাত থেকে সরে না যায়, তাহলে পুরো জিনিসটাই একটা প্রহসন।”
আইনগত জটিলতা এবং আইন প্রণেতাদের উদ্বেগ
ট্রাম্পের বারবার সময়সীমা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন আইন প্রণেতাদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। তাদের অনেকেই এটিকে অবৈধ এবং অকার্যকর বলে আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি টিকটক নিষিদ্ধ করার বিরোধী সিনেটর এড মারকি (ডি-এমএ), ক্রিস ভ্যান হলেন (ডি-এমডি) এবং কোরি বুকার (ডি-এনজে) ট্রাম্পকে চিঠি লিখেছিলেন যে “আপনার প্রশাসনের পক্ষে আইনে উল্লেখিত প্রয়োজনীয়তাগুলো উপেক্ষা করে যাওয়া অগ্রহণযোগ্য এবং অকার্যকর হবে।” তারা সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে “টিকটকের সময়সীমার যেকোনো অতিরিক্ত বর্ধিতকরণ ওরাকল, অ্যাপল, গুগল এবং অন্যান্য কোম্পানিগুলোকে ধ্বংসাত্মক আইনি দায়বদ্ধতার ঝুঁকিতে ফেলতে বাধ্য করবে, যা চিরতরে সমর্থন করা একটি কঠিন সিদ্ধান্ত।”
এর কারণ হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক পরিষেবা প্রদানকারী কোম্পানিগুলোকে নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা পার হওয়ার পরও অ্যাপটিতে প্রবেশাধিকার সহজ করার জন্য জরিমানা করা যেতে পারে। ট্রাম্পের বর্ধিতকরণগুলো আইনের অনুমোদিত পদ্ধতির বাইরে ছিল। তবে, এখন পর্যন্ত এই কোম্পানিগুলো প্রশাসনের আশ্বাস উপর নির্ভর করে চলেছে যে টিকটক অনলাইন রাখার জন্য তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে না। রয়টার্স সূত্রে জানা গেছে, অ্যাপল এবং গুগলের উদ্বেগ কমাতে স্বয়ং মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছ থেকে একটি চিঠি প্রয়োজন হয়েছিল।
এই বিষয়ে একটি আদালত ট্রাম্পের পদক্ষেপের বৈধতা মূল্যায়ন করতে পারে, তবে কেবলমাত্র যদি কেউ বর্ধিতকরণ বন্ধ করার জন্য মামলা করে – এবং এখন পর্যন্ত কেউ তা করেনি। তবে, চলতি মাসের শুরুতে গুগলের একজন শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন, অভিযোগ করে যে তারা বিচার বিভাগের আশ্বাসের অধীনে আইন লঙ্ঘন করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ রেকর্ড শেয়ার করতে ব্যর্থ হয়েছে। একই শেয়ারহোল্ডার এর আগেও বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন, অভিযোগ করে যে তারা অ্যাপল এবং গুগলের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে তথ্য শেয়ার করতে ব্যর্থ হয়েছে।
রিপাবলিকানদের মধ্যেও বিভাজন এবং কার্যকর সমাধানের খোঁজে
ট্রাম্পের নিজ দলের অনেক সদস্য তার বর্ধিতকরণগুলোকে সরাসরি অবৈধ না বললেও, কিছু হাউস রিপাবলিকান একটি বিবৃতিতে বলেছিলেন যে “যেকোনো সমাধান অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে মার্কিন আইন অনুসরণ করা হয়, এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টি আমেরিকান ব্যবহারকারীদের ডেটা অ্যাক্সেস করতে পারবে না বা আমেরিকানরা যে বিষয়বস্তু গ্রহণ করে তা ম্যানিপুলেট করতে পারবে না।” সিনেটর জশ হাউলি (আর-এমও) সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে ট্রাম্পের “আইন প্রয়োগ করা উচিত এবং টিকটক নিষিদ্ধ করা উচিত। এই মাঝামাঝি পথটি আমি মনে করি না যে কার্যকর।”
তবে, কী এমন বিষয় যা ট্রাম্পকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্ধিতকরণ অনুমোদন করা বা আইনের শর্ত পূরণ করে না এমন একটি চুক্তি অনুমোদন করা থেকে বিরত রাখতে পারে তা পরিষ্কার নয়। হাউলি এপ্রিল মাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় স্বীকার করেছিলেন যে, “কংগ্রেস, আমাদের নিজস্ব কোনো প্রয়োগকারী সংস্থা নেই।” অর্থাৎ, আইন থাকলেও তা কার্যকর করার ক্ষমতা তাদের হাতে সরাসরি নেই।
সমগ্র বিষয়টি থেকে এটাই স্পষ্ট হয় যে টিকটকের ভবিষ্যত শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতা, ডেটা নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের এক জটিল বুনট। ট্রাম্প প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপগুলো আইনি এবং নৈতিক উভয় দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বাইডেন প্রশাসন যদিও সরাসরি নিষেধাজ্ঞার পথ থেকে সরে এসেছে, কিন্তু টিকটকের ওপর নজরদারি এবং সম্ভাব্য বিধিনিষেধের সম্ভাবনা এখনো বিদ্যমান। বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি আইন এবং ডেটা সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
তথ্যসূত্র:
- The Verge
- Reuters
- CNN
- Bloomberg
- The New York Times
- White House Press Secretary’s Statement
- Statements from US Senators and Congressmen
